সাকিব আল হাসান: বাংলার ক্রিকেটের বিতর্কিত নবাব
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল-কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যে কজন খেলোয়াড়ের নাম উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে সাকিব আল হাসান নিঃসন্দেহে অন্যতম। সাকিব আল হাসান এর পরিসংখ্যান, পারফরম্যান্সের বিচারে, কিংবা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল-এর ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে একাধিক বিতর্ক, সমালোচনা ও আলোচনার ঝড়। তাই হয়তো তাকে বলা যায়—বাংলার ক্রিকেটের “বিতর্কিত নবাব”।
উত্থানের গল্প: এক বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম
২০০৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতে অভিষেক হয় সাকিব আল হাসান-এর। তখন থেকেই তার ব্যাটিং ও বোলিং প্রতিভা ক্রিকেট বিশ্ব-কে আলোড়িত করে তোলে। বাঁহাতি স্পিন এবং মিডল-অর্ডারে দায়িত্বশীল ব্যাটিং দিয়ে দ্রুতই দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি।
বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়ার কৃতিত্ব সাকিব আল হাসান প্রথম অর্জন করেন ২০০৯ সালে, যা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল-এর জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। এরপর বহুবার তিনি এই মুকুট মাথায় তুলেছেন, যা তাকে একজন “জন্মগত নেতা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
সাফল্যের মুকুটে অসংখ্য পালক
সাকিব আল হাসানের রেকর্ড ও অর্জন এত বিশাল যে, সেটি এক নিবন্ধে তুলে ধরা কঠিন। তবে কয়েকটি অনন্য অর্জন হলো:
- ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯: ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ড পারফরম্যান্স (৬০৬ রান, ১১ উইকেট)
- টেস্টে পাঁচ হাজার রান ও ২০০ উইকেট: বিশ্বের মাত্র কয়েকজন ক্রিকেটারের মধ্যেই তিনি একজন
- সাকিব আল হাসানের রেকর্ড: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক
- আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে বেশি সময় অলরাউন্ডার হিসেবে শীর্ষে থাকার রেকর্ড
- আইপিএল, পিএসএলসহ বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তার সাফল্য
এই অর্জনগুলো তাকে cricket বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত করেছে।
বিতর্কের ছায়া: কেন তিনি “বিতর্কিত নবাব” ?
১. ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগ
২০১৯ সালে আইসিসির তদন্তে উঠে আসে, সাকিব আল হাসান জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন কিন্তু তা বোর্ড বা আইসিসিকে জানাননি। এর ফলে তিনি এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হন। এই ঘটনা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল-কে বড় ধাক্কা দেয়।
২. বিসিবির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী মানসিকতা
সাকিব প্রায়শই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়ান।
- ২০১৯ সালে তিনি বিসিবির বিরুদ্ধে ক্রিকেটারদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন
- একাধিকবার বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন
- ২০২৩ সালে লঙ্কান প্রিমিয়ার লিগ খেলতে চাওয়ায় বিসিবির সঙ্গে নতুন করে বিরোধে জড়ান
৩. মাঠে আগ্রাসী আচরণ ও আম্পায়ারদের প্রতি অসন্তোষ
- বিপিএলে স্টাম্পে লাথি মারা ও আম্পায়ারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়
- আন্তর্জাতিক ম্যাচেও একাধিকবার আম্পায়ারদের সঙ্গে অসদাচরণ করার অভিযোগ এসেছে
৪. টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি অনীহা ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ
- একাধিকবার তিনি টেস্ট সিরিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন
- টেস্ট খেলার চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে বেশি আগ্রহী বলে সমালোচিত হয়েছেন
বিতর্কে মোড়া ক্যারিয়ার: তাহলে সাকিব কে? নায়ক নাকি খলনায়ক?
সাকিব আল হাসান-এর ক্যারিয়ার যেন একটি দ্বৈত চরিত্রের গল্প। একদিকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সেরা পারফরমার, অন্যদিকে বিতর্ক তাকে বারবার বিতর্কিত নবাব বানিয়ে তুলেছে।
তবে সমালোচনা যাই হোক, তার মতো গেম চেঞ্জার বাংলাদেশে দ্বিতীয়জন নেই। তার প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস, লড়াকু মানসিকতা এবং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা তাকে কিংবদন্তিদের কাতারে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পোস্টার বয়, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ক্রিকেটার—এটাই সাকিব আল হাসান-এর জীবনগাথা। তার ক্যারিয়ার যেমন সাফল্যে ভরপুর, তেমনি বিতর্কের আঁচড়ও স্পষ্ট। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কীভাবে তাকে মনে রাখবে, তা নির্ভর করবে তার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপর।
সাকিব আল হাসান কি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের চিরস্থায়ী নায়ক? নাকি বিতর্ক তাকে ছাপিয়ে যাবে? উত্তরটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
মো. ইশতিয়াক হোসেন রাতুল, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
Read More : পঞ্চপাণ্ডব বিহীন বাংলাদেশ ক্রিকেট: এক শূন্যতার করুণ অধ্যায়