শবে কদর: হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রাতের ইতিহাস, ফজিলত ও ইবাদত

ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র ও ফজিলতপূর্ণ রাতগুলোর একটি শবে কদর।

কুরআনে বর্ণিত আছে, এটি এমন রাত, যেটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য অসংখ্য রহমত ও বরকত বর্ষণ করেন এবং বান্দাদের দোয়া কবুল করেন। এই বিশেষ রাতেই মহান আল্লাহ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর প্রথম ওহী নাজিল করেছিলেন। এই ওহীগুলোই পরবর্তীতে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফে পরিণত হয়। তাই বলা যায় এই রাতেই মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য কুরআন শরীফ নাজিল করেছিলেন। প্রতিবছর তাই বিশ্বের সকল মুসলিমরা শবে কদর এর রাতকে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে ইবাদতের মাধ্যমে পালন করে। পুরো রাত মুসলিমরা মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে। শবে কদর এর নামাজ, আমল আর দোয়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই রাতে ইবাদত মুসলিমদের জন্য গুনাহ মাফের শ্রেষ্ঠ সময়।

শবে কদরের সম্ভাব্য তারিখ

ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শবে কদরের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই। এটি রমজানের শেষ দশকের রাতের বিজোড় রাতগুলোর কোনো এক রাতে সংঘটিত হয়। মুসলিম পণ্ডিতদের মতে শবে কদর ২১, ২৩, ২৫, ২৭ অথবা ২৯ তারিখের যেকোনো এক রাতে সংঘটিত হয়।

তবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) ২৭তম রাতকে শবে কদরের রাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মুসল্লিরা রমজানের ২৬তম দিবাগত রাতকে শবে কদর হিসেবে পালন করে। সে হিসেবে বাংলাদেশে ২০২৫ সালে শবে কদর ২৮ মার্চ, শুক্রবার (রমজানের ২৬ তারিখের রাত, অর্থাৎ ২৭ তারিখ দিবাগত রাতে) শবে কদর পালিত হবে।

লাইলাতুল কদরের ইতিহাস

কুরআনে শবে কদরের গুরুত্ব

মহান আল্লাহ তায়ালা এই রাতের গুরুত্বকে বর্ণনা করে কুরআনে সম্পূর্ণ একটি সূরা নাজিল করেছেন – সূরা আল-কদর (৯৭তম সূরা) এই সূরায় আল্লাহ স্পষ্ট বলেন :

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ

سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

অর্থ:

আমি একে (কুরআন) শবে কদরের রাতে নাজিল করেছি।

তুমি কি জানো, শবে কদর কী?

শবে কদর হলো এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

এই রাতে ফেরেশতারা এবং জিবরাইল (আ.) তাঁদের রবের আদেশ নিয়ে অবতীর্ণ হন।

এটি শান্তিময় রাত, যা ফজর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

এই সূরা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শবে কদরের রাত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় এক রাত, কারণ এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর রহমত, বরকত এবং মাগফিরাতের দরজা মানবজাতির জন্য খুলে রাখেন। এই রাত ইমানদারদের মনে শান্তির বাতাস বয়ে আনে। অস্থির আর অশান্ত মনকে শীতল এক ছায়ায় ঢেকে ফেলে।

হাদিসে শবে কদরের গুরুত্ব

হাদিসে শবে কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসংখ্য ব্যাখ্যা ও উক্তি পাওয়া যায়।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন :

“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় শবে কদরে ইবাদত করবে, তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।”

— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০১)

অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন—

“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর অনুসন্ধান করো।”

— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৭)

শবে কদরের ফজিলত ও বরকত

শবে কদরে এর রাতে যারা আন্তরিকভাবে তওবা করবেন, আল্লাহ তাদের অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ এই রাতের ইবাদতকে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি মর্যাদাপূর্ণ করেছেন। এই বিশেষ রাতে যে ব্যক্তি ইবাদত করবে, সে ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার সমতুল্য সওয়াব লাভ করবে। এই রাত আল্লাহর বান্দাদের দোয়া কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ। এই রাতে নেক নিয়ত নিয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু-হাত তুলবে, তার দোয়া কবুল হবে বলে আশা করা যায়। এমনকি এই রাতে ফেরেশতারাও দুনিয়াতে নেমে আসেন এবং মুমিনদের জন্য শান্তি ও রহমতের দোয়া করতে থাকেন। হাদিস ও তাফসির মতে, এই রাতে আল্লাহ পরবর্তী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন।

শবে কদরের নামাজের নিয়ম ও আমল

শবে কদরের নামাজ কত রাকাত?

শবে কদর এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামাজের সংখ্যা নেই। ইসলামি স্কলারদের মতে শবে কদরের রাতে মূলত নফল ইবাদত যত করা যায়, ততই ভালো। সাধারণত মুসল্লিরা শবে কদরের রাতে দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করেন।

শবে কদরের নামাজের নিয়ম

নফল নামাজ :

দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়া যায়। এভাবে ১২ রাকাত পড়া উত্তম। তবে যত বেশি পড়া যায়, তত বেশি সওয়াব। নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা ইখলাস, সূরা কদর, আয়াতুল কুরসি বা তাকাসুর ইত্যাদি মিলিয়ে পড়া অধিক সওয়াবের কাজ। কেউ যদি উপরে উল্লিখিত সূরাগুলো না পারেন, সে ক্ষেত্রে সূরা ফাতিহার সাথে যেকোনো ছোট সূরা পড়তে পারেন।

সালাতুল তওবা, সালাতুল হাজত, সালাতুল তাসবিহ নামাজগুলোও চাইলে পড়া যেতে পারে। এছাড়াও রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে।

বিশেষ দোয়া ও তওবা

হযরত আয়েশা (রা.) রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমি যদি শবে কদর পেয়ে যাই, তাহলে কোন দোয়া পড়ব?”

রাসূল (সা.) বলেন, এই দোয়াটি পড়বে—

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।

উপসংহার

তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত শবে কদরের রাতের তাৎপর্য উপলব্ধি করা এবং বেশি বেশি নেক আমল ও আল্লাহর ইবাদতে এই রাত অতিবাহিত করা।

আল্লাহ এই রাতের উসিলায় আমাদের সকলের গুনাহ মাফ করুন এবং এই রাতের পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তৌফিক দান করুন, আমিন

Read More : গাজায় মানবিক সংকট চরমে! চাপে ট্রাম্পের গাজা দখল পরিকল্পনা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *