বাংলাদেশের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে লুকিয়ে আছে অনেক রকমের ইতিহাস। যুগে যুগে এই দেশের ভূমি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও শাসকের শাসনের দ্বারা কোনো না কোনোভাবে অনুপ্রাণিত বা নতুন কোনো স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মুঘল শাসনামলের স্থাপত্যশৈলী বাংলার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হচ্ছে ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত সাত গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদটি যেমন মুঘল স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে তুলে ধরে, তেমনি সাত গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অতীতের গল্পও বর্ণনা করে। আপনি যদি একবার হলেও গুগলে সার্চ করে থাকেন best places to visit in Bangladesh অথবা best places to visit in Dhaka, তাহলে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অবশ্যই যে জায়গাটি আপনার একবার হলেও দেখা উচিত, সেটি হলো সাত গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়, বরং মুঘল স্থাপত্য ও ইতিহাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।
সাত গম্বুজ মসজিদের নির্মাণ ও ইতিহাস
১৭শ শতকের দিকে বাংলায় তখন মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন চলছিল। এসময় বাংলার মুঘল সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তার সময় বাংলা অঞ্চলে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে সাত গম্বুজ মসজিদ অন্যতম। মূলত, এই মসজিদটি ১৬৮০ সালে শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমিদ খাঁর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এই সময়টি বাংলাদেশে মুঘলদের প্রভাব ও স্থাপত্যশৈলীর বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাত গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী মুঘলদের অসাধারণ নকশা ও রুচির উদাহরণ। এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীকালে বাংলার অন্যান্য স্থাপনায় প্রভাব ফেলেছিল।
সাত গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠত্ব
সাত গম্বুজ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ৭টি গম্বুজ, যা একে মুঘল আমলের অন্যান্য মসজিদ থেকে আলাদা করেছে। কারণ, মুঘল আমলে তৈরি বেশিরভাগ মসজিদে সাধারণত ৩টি গম্বুজ দেখা যায়। এই মসজিদের তিনটি প্রধান কক্ষের উপর তিনটি প্রধান গম্বুজ এবং পাশাপাশি চারটি ছোট গম্বুজ রয়েছে, যা এর সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে। মসজিদের দুই পাশে দুটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে, যা মুঘল স্থাপত্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারটি সুসজ্জিত খিলান দিয়ে নির্মিত, যা মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।
মসজিদের দেওয়ালে উপরে চুন-সুরকির কাজ, পোড়ামাটির নকশা ও মার্বেল পাথরের কারুকাজ করা হয়েছে। এছাড়াও, মসজিদের ভেতরে তিনটি মেহরাব ও খিলানে খোদাই করা নকশা রয়েছে, যা মুঘল স্থাপত্যের নিপুণ শৈলীকে তুলে ধরে। বাইরে থেকে মসজিদটি লালচে রঙের মনে হতে পারে, কারণ এতে মুঘলদের বহুল প্রচলিত লালচে রঙের ইট ব্যবহার করা হয়েছিল।
সাত গম্বুজ মসজিদের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব
এই মসজিদটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি বাংলাদেশের ইসলামী ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সংহতির প্রতীক হয়ে আছে। স্থানীয় মুসলমানদের জন্য এটি ৩৪৫ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় হিসেবে রয়েছে এবং প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসপ্রেমী মুসলিমরা এই মসজিদটি দেখতে আসেন এবং এখানে নামাজ আদায় করেন। এছাড়া, এটি ঢাকার অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হওয়ায় গবেষকদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান হিসেবে সাত গম্বুজ মসজিদ
বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে সাত গম্বুজ মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। দেশি ও বিদেশি পর্যটক, যারা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে। ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে এই মসজিদটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য।
সাত গম্বুজ মসজিদ কোথায় অবস্থিত এবং কীভাবে যাবেন?
মসজিদটি পুরান ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত। ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে সহজেই এই মসজিদে আসা যায়। তবে প্রথমে আসাদ গেট আসার চেষ্টা করুন। এরপর আসাদ গেট থেকে একটি রিকশা নিলে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই আপনি এই মসজিদে পৌঁছে যাবেন।
আপনি যদি ঢাকার দর্শনীয় স্থানসমূহ বা পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চান, তাহলে অবশ্যই একবার সাত গম্বুজ মসজিদ পরিদর্শন করা প্রয়োজন।
Read More : শবে কদর: হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রাতের ইতিহাস